গরু রচনা – গরু ডাকে, হে হাম্বা হাম্বা হাম্বা

Cow

But people love a hypocrite, you know, they recognize one of their own, and it always feels so good when someone gets caught with his pants down and his dick up and it isn’t you.

― Stephen King

 

গরু রচনা – ছেলেবেলা বা মেয়েবেলা

গরুর চারটে পা, একটা লেজ আর লেজের নিচে একটু কালো কালো চুল, একটা মাথা আর মাথার ওপর দু’টো শিং। গায়ের রঙ সাদা, কালো, সাদার ওপর ছোপ ছোপ ও নানান রঙের হয়। এই অব্দি লিখে ভবো (পাগলা) কাইত। এরপর কি লিখবে বুঝতে পারছেনা বেচারা। হঠাৎ করে মনে পরলো গরু দুধও দেয়। লেখা শুরু হল আবার, গরু দুধ দেয়, আর সেই দুধ খেয়ে লোকের উপকার হয়। এরপর তো রচনা আর এগোচ্ছেনা, ভবোর কলম আটকে গেছে কাটা রেকর্ডের মতো । কি করে? আর কি করে? কিচ্ছু করার নেই তোর। শুধু একটু বড় হতে হবে তোকে হাতে পায়ে। তাহলেই, সাঙ্গ হবে খেলা আর রচনা।

গরু দর্শন

আস্তে আস্তে ভবো একটু বেড়ে উঠতেই, এই রচনারও আকার আকৃতি, প্রকৃতি, প্রকৃত রূপে পরিবর্তনের মুখে। যে গরু তাকে ছেলেবেলায় এতবার ফ্যাঁসাদে ফেলে মজা দেখেছে, সেই আজ তার মায়ের দয়ায় ও শিক্ষায় ভগবান রূপে মর্তে অবতীর্ণ। যিনি মাঝে মাঝে তার বাড়িতে আসেন, বিশেষ রঙধারি এক লোক তার মগজের আলকে আলকিত আজ ভবো।

আসলে, বর্তমানে এতগুলি গরু বলয়ের জন্ম হয়েছে বা আমদানি করা হয়েছে, যা দেখে শরীরের জ্বলন বোধহয় স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিক বৃত্তি আমাকে আজ ভবোর মুখোমুখি এনে দাঁড় করাল। প্রথমে, সে তো মানতেই চাইল না আমি যে হিন্দু ঘরের সন্তান। মুসলিম হলে কাফের, আর হিন্দু হলে মুসলমান বানানো বড্ড সহজ কাজ আজকাল।

আমি ও ক্যালানে আমি

রোজ সকালে আমি আমার বাড়ির কাছে এক পার্কে যাই, দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে হবে। সেই সুত্রেই নানান মানুষের আসা যাওয়া, এক গ্রুপ ভাঙ্গা থেকে শুরু করে নানান গ্রুপের জন্ম মৃত্যু অনেকটাই উপলব্ধি করেছি। কিছু বছর হল এক নতুন গ্রুপের সাথে আমার সকালের ব্যায়াম করার সুবাদে ঘর করা। নানান হাসি, মজা, তর্ক বিতর্ক, বিশেষত রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দেশ উদ্ধার করা, এই সব কম্ম সকাল সকাল করার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। দেশ উদ্ধারকারীদের যে জ্ঞান, তা গরুর চারটে পা, একটা লেজ আর লেজের নিচে একটু কালো কালো চুল পেরিয়ে কোন এক অন্ধকার গলিতে গিয়ে থেমেছে তা বোধহয় আমি বুঝতে পারিনি। তাই আত্মশুদ্ধিকরণের সাথে সাথে কবে যে আমি তাদের কাছে গরুখেকো কাটা মাল হয়ে উঠেছি তা আমার বোঝার বাইরে ছিল। আসলে টেনিয়াদের ভাষায় ‘আকাশে পাখি দেখে পালক গুনে দেবো’ এই কনফিডেন্স যে কতটা আমার জন্য অসত্য ছিল তাও আমি বুঝে উঠতে পারিনি। কোন এক অজ্ঞাত কারণে কয়েক মাস যাবত ঋকবেদ, মনুসংহিতা, বা চরকসংহিতা এই ধরনের প্রাচীন মাল পত্তর ঘাটাঘাটি শুরু করলাম। শুধু কি তাই, রামায়ণ বা মহাভারতের যৌনতা আর হিংস্রতা আমাকে ভাবাতে শুরু করে দিল। এর নানান ছাপ পরতে শুরু করল আমার জীবনে। আর এরই সুত্র ধরে সকালের ব্যায়ামের সাথে সাথে চলতে থাকল এই নিয়ে কথা বার্তা। প্রথম দিকে সবার কথা শুনে যা মনে হল রামায়ণ বা মহাভারতও নাকি বেদ। সে যাই হোক, এই ধরনের মানুষ গুলো প্রথম দিকে খুশি ছিল যে আমি আবার হিন্দু হবার চেষ্টা করছি, কারণ আমি বেদ পড়ছি।

আমি ও বর্তমান বালের সমাজ

গণ্ডগোলটি পাকলো সেদিন, যেদিন আমি, ” গোমাংস এক সময় হিন্দুরা খেত” এবং এক সময় কার্যত বিবেকানন্দও সমর্থন করেছেন এই বক্তব্যটি, সেটি বলাতে । এই শুনেই এক দল বন্ধুর চেহারা আমার কাছে মুহূর্তের মধ্যে ভয়ঙ্কর অচেনা হয়ে গেলো। কথা দিলাম পরের দিন সকালে ঋকবেদ থেকে কিছু শ্লোক তাদেরকে শোনাব যা আমার বক্তব্যকে সমর্থন করে। কথা মতো, তার পরের দিন সকালে নির্দিষ্ট সময় সকলে প্রায় জনা ২৫/৩০ এসে হাজির হল। তাছাড়াও কিছু অচেনা মুখ দেখলাম এদের মধ্যে। এর মধ্যে স্বয়ং সেবকদেরও কিছু কিছু মুখের উকি দেখা গেলো। কথা ছিল প্রথমে ইংলিশে পড়ে তার পর সেটাকে বাংলায় অনুবাদ করে শোনাতে হবে, আর যদি পারি খানিক হিন্দিতে ট্রান্স্‌লেট করে দিলে ভালো হয়। ইংলিশে পড়া শেষ হতে না হতে আমি রোষের আগুনে পরলাম। এই প্রথম হিন্দুদের ফতোয়া দিতে দেখলাম। ফতোয়াটা মনে হল মানুষের ধর্মের ওপর নির্ভর করেনা, ওটা মানুষের অধিকার। ‘কনডোম ব্লগার’ তখন সামাজিক বয়কটের মুখোমুখি। যাকে ধরে ফেলা হল “হিন্দুস্তান কি জয়” এবং “হর হর মহাদেব” বলতেই হবে। না, আমি বলিনি, বলেতেই পারতাম হয়তো, জেদে বললাম না। তাছাড়া, আমার দেশের তিনটে নাম “ইন্ডিয়া”, “ভারত” আর “হিন্দুস্তান”। সত্যি বলতে হিন্দুস্তান আমার দেশের নাম আমি মানিনা। আমার দেশ ভারত এবং আমি ভারতের সন্তান।

সে যাই হোক, ভবোকে আমার সেই সকালের অভিজ্ঞতা শোনালাম। আর, সেদিন যা যা তাদেরকে শুনিয়েছিলাম, সেটাই ভাগ করতে চাইলাম ভবোর সাথে। শুরু করলাম ভবোকে বলা।

ঋকবেদ
Mandala 8/Hymn 43/11
– Let us serve Agni with our hymns, Disposer, fed on ox and cow, Who bears the Soma on his back.

Mandala 8/Hymn 43/17 – My praises, Agni, go to thee, as the Cows seek the stall to meet, The lowing calf that longs for milk.

Mandala 10/Hymn 16/7 – Shield thee with flesh against the flames of Agni, encompass thee about with fat and marrow, So will the Bold One, eager to attack thee with fierce glow fail to girdle and consume thee.

Mandala 10/Hymn 79/6 – Agni, hast thou committed sin or treason among the Gods? In ignorance I ask thee. Playing, not playing, he gold-hued and toothless, hath cut his food up as the knife a victim.

Mandala 10/Hymn85/13 – The bridal pomp of Surya, which Savitar started, moved along.
In Magha days are oxen slain, in Arjuris they wed the bride.

Mandala 10/Hymn 85/14 – When on your three-wheeled chariot, O Asvins, ye came as wooers unto Surya’s bridal, Then all the Gods agreed to your proposal Pusan as Son elected you as Fathers.

Mandala 10/Hymn 87/16 – The fiend who smears himself with flesh of cattle, with flesh of horses and of human bodies, Who steals the milch-cow’s milk away, O Agni,-tear off the heads of such with fiery fury.

Mandala 10/Hymn 87/17 – The cow gives milk each year, O Man-regarder: let not the Yatudhana ever taste it. If one would glut him with the biesting, Agni, pierce with thy flame his vitals as he meets thee.

Mandala 10/Hymn 87/18 – Let the fiends drink the poison of the cattle; may Aditi cast off the evildoers.
May the God Savitar give them up to ruin, and be their share of plants and herbs denied them.

Mandala 10/Hymn 87/19 – Agni, from days of old thou slayest demons: never shall Raksasas in fight o’ercome thee. Burn up the foolish ones, the flesh-devourers: let none of them escape thine heavenly arrow.

Mandala 10/Hymn 89/14 – Where was the vengeful dart when thou, O Indra, clavest the demon ever beat on outrage? When fiends lay there upon the ground extended like cattle in the place of immolation?
মনু সংহিতা
Chapter V – 18 – The porcupine, the hedgehog, the iguana, the rhinoceros, the tortoise, and the hare they declare to be eatable; likewise those (domestic animals) that have teeth in one jaw only, excepting camels.

Chapter V – 30 – The eater who daily even devours those destined to be his food, commits no sin; for the creator himself created both the eaters and those who are to be eaten (for those special purposes).

Chapter V – 35 – But a man who, being duly engaged (to officiate or to dine at a sacred rite), refuses to eat meat, becomes after death an animal during twenty-one existences.

যুক্তিহীন চুলকানি

মাঝে মাঝেই, ওর মধ্যে চরম উত্তেজনা ও আমার প্রতি রাগ দেখতে পেলাম। এত সহজে ওকে পড়ে শোনাতে পারিনি, অবশেষে সবটুকু পড়ে শোনাতে পেরেছিলাম অবশ্য। ও মুখ খুলল, ‘পারবেন কোরান নিয়ে কোন কথা বলতে?‘ ‘দম থাকলে লিখে দেখান, ক্ষমতা থাকলে তিন তালাক নিয়ে মুখ খুলুন‘ মেরে মুসলিমরা গাঁড় ফাটিয়ে দেবে। ওকে বললাম, হিন্দু ধর্মের যে জায়গা গুলো ছুঁয়ে গেলাম এর অনেক পরে ইসলামের জন্ম। আর সত্যি বলতে, কোরাণ যে আসমানি কিতাব নয়, তা যেকোন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বোঝে বা জানে। প্রচুর কিছু শুদ্ধিকরণের পর বিশেষ বিশেষ টেক্সট্‌ বা প্রচুর কিছু অ্যাডপ্ট করা হয়েছে এই ধর্মে। যেমন আমরা খেতাম, ছেড়ে দিয়েছি। অনেক পরে ওরা জন্ম নিয়েছে, ওরা খাওয়া শুরু করেছে। আর একটা কথা “নিকাহ্‌” দেখে ভাই সব কিছু বুঝতে বা জানতে যেও না। গরু থেকে শুয়োর হতে পারতো? গরু থেকে কি ভাবে তিন তালাকে আসতে পারে? এবার ওর আরেক প্রশ্ন “পারবেন কোন মুসলিমকে শুয়োর খাওয়াতে? অনেক প্রগতিশীল মুসলমান আমার দেখা আছে”। সত্যি বলতে, পারবো না। আসলে, যতটুকু আমার জানা আছে, শুধু ইসলামে নয় খ্রিষ্টধর্মেও ২-৩ জায়গায় শুয়োর খাবার কথা বারন করা আছে। কিন্তু অনেক খ্রিস্টান কিন্তু শুয়োর খায়, আমি জানি, মুসলমানরা কিন্তু খায়না। অন্তত আমার দেখা কোন মুসলমানকে আমি শুয়োর বা পর্ক খেতে দেখিনি। কারণ হিসাবে আধুনিক বা তথাকথিত প্রগতিশীল মুসলমানেরা যে বিজ্ঞান সম্মত কারণ, যেমন ফিতা ক্রিমি বা নানান রোগের কথা শুয়োর খাবার ফলে হতে পারে বলে, অন্তত তা আসল কারণ নয় বলে আমার মনে হয়। আসল কারণ ওই “হারাম” হয়ে থেকে যায়। অন্তত, যা আমি নিজে উপলব্ধি করেছি সাধারণ ভাবে হালাল ছাড়া মাংস না খাওয়া বা ধর্মীয় গোঁড়ামি অনেকটাই বেশি বলে আমার মনে হয়। ঠিক যেমন ক্রিস্টান হলে গরম কালেও স্যুট পরতেই হবে এবং বাঙ্গালির সাথে কথা বললেও তাকে ইংরেজিতেই কথা কইতেই হবে আরকি।

তিন তালাক

বিয়ে হলে তবেইতো তালাক হবে, তাই তো? তাই একটু বিয়ে দিয়ে ঢুকে তালাক দিয়ে বেড়িয়ে যাবো। আসলে, হিন্দুদের বিবাহ হল ঐশ্বরিক ঘটনা আর নিকাহ্‌ বা মুসলিম বিয়ের ভিত্তি হল এক ধরনের চুক্তি বর ও বউয়ের মধ্যে। যে চুক্তিটিকে নিকাহ্‌নামা বলা হয়, যার মধ্যে অনেক শর্ত থাকে। অনেকটা, আগে বাঙ্গালদের (হিন্দু) মধ্যে “পাটিপত্র” বলে একটা ব্যবস্থা চালু ছিল, খানিকটা এই ধাঁচের বলা যেতে পারে। যাইহোক, নিকাহ্‌নামা তে একটি বিষয় বাধ্যতামূলক, তা হল, “মেহের্‌” যা বর বউকে দিয়ে তবেই সে মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারবে। বৌ যদি চায় তবে তা ছেড়ে দিতেও পারে(সাধারনত তা হয়না)। কোরাণ অনুযায়ী বা নবীর নির্দেশ মতো বিবাহ বিচ্ছেদ কে বলা হয় “তালাক-ই-সুন্নাহ্‌“। আরেক ধরনের তালাক যা নবীর অনেক পরে ইসলামে অ্যাডপ্ট করা হয়েছে তা হল “তালাক-ই-বিদ্দাহ্‌” যার মানে হলে সঙ্গেসঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ। এই তালাক ফোনে বা এসএমএস করে বিবাহ বিচ্ছেদ করা যায়। এই তালাকেরই বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং তালাক-ই-সুন্নাহ্‌ কে লাঘু করার দাবী উঠেছে। কিন্তু সাধারণ ভাবে মানুষ ভাবে তালাক-ই-বিদ্দাহ্‌ অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদই ইসলামে আছে। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারনা। যদি আপনি তালাক-ই-সুন্নাহ্‌ কি জানেন তাহলে বুঝতে পারবেন, ইসলামে একজন বিবাহিত মহিলা কতটা নিরাপদ।

তাই এবার তালাক-ই-সুন্নাহ্‌ নিয়ে আমার যা জানা তা আপনাদের বলি। নবীর নির্দেশ বা মতে, রেগে গিয়ে তালাক দেয়া যাবেনা। কোরাণ বলে, প্রথম পর্যায় – বর ও বৌ এর মধ্যে কথা বলে সমস্যার সমাধান করতে হবে, একে বলা হয় “ফাইযু-হুন্নাহ্‌“। যদি তারপরেও সমস্যা না মেটে, দ্বিতীয় পর্যায় – তবে, দুজনের মধ্যে নানান যে দাম্পত্য সম্পর্ক তার থেকে বিরত থাকতে হবে, যতক্ষণ না সব কিছু মিটমাট হয়ে যায়। তারমানে, দুজন শারীরিক ভাবে আলাদা আলাদা থাকবে, এটা করা হয় এই জন্য যাতে তারা আবার এক হয়, একে বলা হয় “ওয়াহ্‌জুরু-হুন্নাহ্‌“। যদি এই পর্যায়েও সফল ভাবে সম্পর্ক পুনরায় জোড়া না লাগে, তৃতীয় পর্যায় – তবে, বরকে উদ্যোগ নিয়ে তার স্ত্রী কে মানাতে হবে বা তার সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করতে হবে, একে বলা হয় “ওয়াযরিবু-হুন্নাহ্‌“। যদি তিনটি পর্যায়েও সম্পর্ক ঠিক না হয়, তবে সালিসি সভা, অর্থাৎ দুটি পরিবার থেকে গুরুজনেরা বসে তা মেটাবার চেষ্টা করবে। এই চারটে পর্যায়েও যদি সম্পর্ক কিছুতেই ঠিক না হয়, তবে বর একবার তালাক বলবে। আরেকটি তালাক বলার আগে বরকে বউয়ের ঋতু বা ইদ্দাহ্‌ শেষ হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। এই ইদ্দাহ্‌ (মনে রাখতে হবে ইসলাম অনুযায়ী ইদ্দাহ্‌ তিন মাসিক কোর্স বলে মনে করা হয়) এর আগে দু’টির বেশি তালাক দেয়া যাবেনা। তার মানে এই তিন মাসের মধ্যে বর তৃতীয় তালাকটি বলতে পারবেনা। এখানে মনে রাখতে হবে, যদি স্ত্রী এমন বয়সে থাকে যেখানে তার রজোবন্ধ হয়েছে তবে, অর্থাৎ ইদ্দাহ্‌ এর সময় তিন মাস। আর যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয় তাহলে, যতক্ষণ না তার সন্তান জন্মাচ্ছে ইদ্দাহ্‌ সময়কাল ততদিন পর্যন্ত। এর পরেও যদি বর ও বৌ এর মধ্যে সমস্যা থেকে যায়, তবে বর তৃতীয় তালাক বলতে পারে। এই ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।

(শালা) হারাম ও শুয়োরের কথা

আগেই বলেছি ইসলামে এবং খ্রিষ্টধর্মেও শুয়োর খাওয়া মানা। যা নিষিদ্ধ তাকেই ইসলাম অনুযায়ী “হারাম” বলে চিহ্নিত করা হয়। এখান আমি বাইবেল থেকে শুয়োর সম্পর্কিত কিছু তথ্য উদ্ধৃতি দিলাম।

Bible – Book of Leviticus chapter 11 verse 7
New International Version
And the pig, though it has a divided hoof, does not chew the cud; it is unclean for you.

King James Bible
And the swine, though he divide the hoof, and be cloven footed, yet he cheweth not the cud; he is unclean to you.

Bible – Book of Leviticus chapter 11 verse 8

New International Version
You must not eat their meat or touch their carcasses; they are unclean for you.

King James Bible
Of their flesh shall ye not eat, and their carcasses shall ye not touch; they are unclean to you.

Bible – Book of Deuteronomy chapter 14 verse 8

New International Version
The pig is also unclean; although it has a divided hoof, it does not chew the cud. You are not to eat their meat or touch their carcasses.

King James Bible
And the swine, because it divideth the hoof, yet cheweth not the cud, it is unclean unto you: ye shall not eat of their flesh, nor touch their dead carcase.

Bible – Book of Isaiah Chapter 65 verse 2-5
King James Version
2 – I have spread out my hands all the day unto a rebellious people, which walketh in a way that was not good, after their own thoughts;

3 – A people that provoketh me to anger continually to my face; that sacrificeth in gardens, and burneth incense upon altars of brick;

4 – Which remain among the graves, and lodge in the monuments, which eat swine’s flesh, and broth of abominable things is in their vessels;

5 – Which say, Stand by thyself, come not near to me; for I am holier than thou. These are a smoke in my nose, a fire that burneth all the day.

বঞ্চিত-বাঞ্চোত

এবার একটি বঞ্চিত বাঞ্চোতের কথা না বললে আমার মুক্তি নেই বা লেখাটি শেষ করা অন্যায় হবে। এখন যে শর্মার কথা বলব তার বাবা ও মা ময়ূর ছিল এবং তাদের সন্তান তাই গরু হয়ে জন্মেছে। আমি সেই দুই ময়ূরের কথা বলছি যারা সেক্স করেনি। যাদের চোখের জল থেকে জন্ম নিয়েছে “চাঁদের” মতন শর্মা কিন্তু জাত গরু। তাই তিনি গরু হয়ে যা সামাজিক, আধ্যাত্মিক বা বৈজ্ঞ্যানিক চেতনার কথা শোনালেন যা শুনে সমগ্র গরু জাতি গর্বিত এবং অবশ্যই গর্ভবতীও হয়ে উঠেছে।

শুধু কি তাই, ৩৩ কোটি দেব-দেবী ওনার দেহে বাস করে (কতো বড় দেহ রে তোর?)। ওনারটা কি বক্র, খুদ্র, শিঘ্রপতন হয় কি? না, একেবারেই না, বরং ওনার ওখান দিয়ে যা বেরোয় মানে মুত, তা যদি আপনি কোল্ড ড্রিঙ্কের মতন পান করেন তাহলে আপনার লিভার (জনি লিভার নয়), হার্ট, মন এবং আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে। শুধু কি তাই, আপনি বুড়ো হবেন না। তাহলে ডঃ লোধকে দেখাবার প্রয়োজন মিটে গেলো। এখানে মুত খাবেন আগের জন্মের পাপ পোঁদ দিয়ে বেড়িয়ে যাবে। কোন এক রাশিয়ান বিজ্ঞানী (এটা রাশিয়ার কোন বঞ্চিত, নাম বলেনি) ওনার কানে কানে বলে গেছেন, ওনার হাগা মানে গোবর বাড়ির দেয়ালে লাগালে মানে ভালো করে গাতন দিলে রেডিয়েশন (কোন ধরনের রেডিয়েশন বলতে ভুলে গেছে) থেকে মুক্তি। ওনার হাগা এখানেই থেমে নেই, টন টন বায়োগ্যাস উৎপাদন করে কোটি কোটি গাছের প্রাণ বাঁচাতে পারে (আমার একখান প্রশ্ন, হাগা পেলে উনি চেপে চেপে কোটি কোটি গাছের গোঁড়ায় গিয়ে গিয়ে কি হেগে আসবেন?)। উনি হাক পারলে মানে হাম্বা হাম্বা করলে বায়ুর কি সব যেন মরে যায়। আপনার বাড়িতে কেউ যদি শ্বাসকষ্টে ভোগে, যদি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়? চিন্তা করবেন না ওনার কাছে নিয়ে যেতে পারেন উনি অক্সিজেন পান করেন আবার অক্সিজেন ছাড়েন। তাই একটি নল ওনার কোথাও লাগিয়ে টানলেই হবে।

কবি প্রনাম

আমার সর্বশেষ নিবেদন, এক বিখ্যাত মানুষের লেখা দু লাইন দিয়ে। ক্ষমা করবেন তার নাম না মনে পরায় লিখতে পারলাম না এটি কার লেখা।

হরে করো কমবা
গরু ডাকে হামবা।
গর্জন করে অম্বা,
মা ডাকেন বুম্বা।
হরে করো কমবা
ডোব্বা ডোব্বা রোব্বা,
হুড় হুড় করে হুম্বা,
তোবা তোবা আব্বা।

উৎস –
১) The Rig Veda – Ralph T.H. Griffith
২) The Laws of Manu – George Bühler
৩) http://biblehub.com
৪) The Emphasised Bible, translated by Joseph Bryant Rotherham, 1916
৫) কোরান
৬) wright-house অনলাইন কোরাণ।
৭) The Bible, the Qur’an and Science by Maurice Bucaille (Author), Alistair D. Pannell (Translator)
8) Triple Talaq: An Analytical Study By Furqan Ahmad


পুনশ্চঃ
– যাদের অদৃশ্য উপকার ছাড়া লেখাটা হয়তো সম্ভব হতোনা তারা হলেন ত্বিষা মুখার্জি সরকারপ্রসাদ বিশ্বাস বা মন মাস্তুল। অসংখ্য ধন্যবাদ দু’জনকে।

স্বত্ব © বংব্লগার আপনার যদি মনে হয় বা ইচ্ছা হয় তাহলে আপনি এই লেখাটি শেয়ার করতে পারেন কিন্তু দয়াকরে এর লেখকের নাম ইন্দ্রজিৎ দাস উল্লেখ করতে ভুলবেন না। ভুলে যাবেননা চৌর্যবৃত্তি মহাদায়, যদি পড়েন ধরা।

যদি আপনি আপনার নিজের ছবি এখানে দেখতে পান এবং তাতে যদি আপনার কোন রকম আপত্তি থাকে তাহলে অবশ্যই ই-মেল করে আপনি উপযুক্ত প্রমাণসহ আপনার দাবি জানাতে পারেন।দাবিটি ন্যায্য প্রমাণিত হলে, সে ক্ষেত্রে ছবিটি সরিয়ে ফেলা হবে।

Advertisements

কাশ্মীরনামাঃ অমরনাথ – এক অধার্মিকের তীর্থ যাত্রা

Amarnath Holy Cave in Amarnath, Jammu and Kashmir, India

অমরনাথ যাত্রা” আর আমি!!! অনেকটা “বুক ভরা চুল দিলি আর মাথা জোরা টাক দিলি” টাইপের। অমরনাথটা কপালে ছিল তাই হয়েগেছে। আমি বিগত কয়েক বছর ধরে ট্রেকিং করছি, যার ফলে অমরনাথ যাত্রা টাও ঐ চিন্তাভাবনা নিয়েই গেছিলাম। আমি তো পেশাদার ট্র্যাভেলার নই, তবুও বহু জায়গায় ঘোরার সৌভাগ্য হয়েছে। অনেক জায়গায় ঘুরলেও, এই ট্যুরটার স্মৃতি আমার জীবনে অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে আজীবন থেকে যাবে। শুরুর দিকটা খুব এলোমেলো ছিল। মানে যাওয়া হবে, কি হবে না, এই যাচ্ছি, তো ঐ যাচ্ছি না। প্রথমেই একটু বলি, ফিটনেস-সার্টিফিকেট এর আবেদন বাতিল হওয়াতে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলেও আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। যাওয়ার দু’দিন আগে পরলাম জ্বরে।

শুরুটা একটু বলা যাক, প্রতিদিনের মতো আমি সেদিনও মাঠে গেছিলাম দৌড়াতে। হঠাৎ, মধু এসে আমাকে অমরনাথ যাত্রার কথা বলে। আসলে, ওর সাথে ভাস্করের যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কিছু ব্যাক্তিগত কাজের জন্য এবার ওর সাথে যেতে পারবেনা। তাই, ওর একজন সঙ্গী লাগবে, তাই ওর আমাকে এই প্রস্তাব।সেই সময় আমি মধু কে চিনতামও খুব কম, তাছাড়া আমার মত নাস্তিকের ধর্মস্থান ভ্রমণ ঠিক মানায় না তাই ওকে Me and Madhu during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, Indiaসরাসরি নাই করে দিলাম। আর ওই সময় আমার অমরনাথ যাত্রা সম্পর্কে যা জ্ঞান ছিল তাতে মনে হয়েছিল যে, এই যাত্রা টা শুধুমাত্র ধর্মীয় যাত্রা। হয়তো সেই সময় আমার এই ধারনাটা ভুল ছিল। আসলে আমার এইটুকু জানা ছিল যে, এটা মাত্র তিনদিনের ট্রেক রুট, আর তাই সেই সময় এত কম দিনের ট্রেক করার আমার কোন ইচ্ছে ছিলনা। আমার তখন মাথায় ছিল বেশ বড় একটা ট্রেক করব। অবশেষে মধু আমাকে মানিয়েই নিল, আর আমরা যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করলাম ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে। আমি যাবো শুনে, যারা আমাকে চিনত, তারা বলা শুরু করল, আমার অমরনাথ যাত্রার সম্মতি প্রমাণ করে যে, আমার মধ্যে নাকি একটা সুপ্ত ধর্মীয় চরিত্র লুকিয়ে আছে। তারা কি ভেবে এই কথা গুলো বলছিল জানিনা, কারণ তারা খুব ভাল করে আমায় চেনে একজন অধার্মিক মানুষ হিসেবেই। কিন্তু এটার মানে এই নয় যে, আমি আমার ধর্ম কে ঘৃণা বা কোনরকম ভাবে অশ্রদ্ধা করি। শুধু এইটুকু বলতে পারি পৃথিবীতে যতগুলো ধর্মের অস্তিত্ব আছে আমি তাদের সবকটাকেই সম্মান করি। এখন, আমি তাদেরকে বলতে চাই, আমি কিন্তু একেবারেই ধার্মিক হয়ে উঠিনি যাত্রার শেষে। হ্যাঁ, এটাও সত্যি, জীবন কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির খানিক পরিবর্তন হয়েছে। কারণ, আমি যাত্রার সময় বিশ্বাসের এক নতুন সংজ্ঞার সন্ধান পেয়েছি, এবং নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি, বিশ্বাস এবং সত্যের সংজ্ঞা।

Unnamed Waterfall during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India On the way to Sangam during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

আবার ফিরে আসা যাক আমার অমরনাথ যাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে, কিন্তু সেটা বলার আগে অমরনাথ মন্দিরের ইতিহাস আপনাদের সঙ্গে একটু ভাগ করে নিতে চাই। সত্যি বলতে অমরনাথ মন্দিরের ইতিহাস বর্ণনা না করলে নিজেকেও খানিকটা অসম্পূর্ণ লাগে। হ্যাঁ, আমার এই অসম্পূর্ণতাটা অনেকের বিরক্তির কারণও হয়ে দাড়াতে পারে, কথা দিলাম খুব অল্প ইতিহাসই বলব, ঠিক যতটা না বললেই নয়।

অমরনাথের গুহা – অমরনাথ হিন্দুদের এক অতি পবিত্র ধর্মীয়স্থান । পাথরের ভাঁজ থেকে চুয়ে চুয়ে পরা জল বরফ হয়ে প্রাকৃতিক ভাবে এক ঐশ্বরিক শিবলিঙ্গের জন্ম দেয়। প্রতিবছর এই শিবলিঙ্গের জন্ম হয় এবং এটি হিন্দু ধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। মে থেকে অগাস্ট মাসের মধ্যে পাথর থেকে জল আস্তে আস্তে চুইয়ে চুইয়ে পরতে থাকে আর সেটি জমে যাবার পর শিবলিঙ্গের রূপ নেয়। এই গুহার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও আছে, ভগবান শিব এখানেই জীবনের সত্য উন্মচন করেন, ও অমরত্বের সন্ধান পান যা তিনি তাঁর ঐশ্বরিক সঙ্গিনী দক্ষিয়ানি (যিনি পরবর্তী কালে পার্বতী বা মা দুর্গা নামে পরিচিত) সতীকে বর্ণনা করেন। অমরনাথ একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম, তাই হিন্দুধর্মে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

পৌরাণিক দিক – কথিত আছে, জীবনের সত্য ও অমরত্বের উন্মোচন করতে দেবাদিদেব শিব অমরনাথের গুহা কে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি দেবী পার্বতীকে নিজের সঙ্গিনী হিসেবে বেছে নেন। তিনি যখন গুহায় গিয়েছিলেন, তিনি পহল্‌গাম, চন্দনওয়ারির রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলেন। যাত্রাকালে মহাদেব এক এক করে তাঁর সমস্তটাই ত্যাগ করেছিলেন। সর্বপ্রথমে তাঁর বাহন নন্দী কে পহল্‌গামে ত্যাগ করেন, এরপর ত্যাগ করেন তাঁর শিরে পরিধেয় অর্ধচন্দ্রটি কে। শেষনাগে পৌঁছে তিনি ত্যাগ করেন তাঁর শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার ও প্রিয়সঙ্গী বাসুকিকে। যদি কেউ পুন্যগুহার উল্টোদিকের পর্বতশিখরটি খেয়াল করেন দেখবেন সেটি অবিকল সাপের ফণার আঁকারের। এখনও বহু মানুষ বিশ্বাস করেন, বাসুকি এখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন। যখন তিনি মহাগুনা (মহা গনেশ পর্বত) শিখরে পৌঁছান, তখন তিনি তাঁর পুত্র গনেশ কে ত্যাগ করেন। পঞ্চতরণী পৌঁছে ত্যাগ করেন পৃথিবী, বায়ু, অগ্নি, জল, আকাশ, যা মহান আত্মাহুতির প্রতীক।

অমরনাথ গুহার আবিষ্কার – বিশ্বাস করা হয় যে, প্রাচীনকালে কাশ্মীর উপত্যকা ছিল জলের তলায়। কাশ্যপমুনি সেই জল নানান নদীর ধারার জন্ম দিয়ে নিষ্কাশিত করেন। যখন সম্পূর্ণ জল কাশ্মীর উপত্যকা থেকে সরে যায় তখন, ঋষি ভৃগু, প্রথম মানুষ যিনি অমরনাথ গুহায় বাবার দর্শন করেন। হিন্দুপুরাণ অনুযায়ী এটি ছিল অমরনাথ গুহার আবিষ্কারের কারণ। সাধারণ মানুষের মুখে এই গুহার আবিষ্কার নিয়ে আরেকটি কথার প্রচলন আছে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে, এক মেষপালক (গুজ্জ্যার বুটা মালিক) এই গুহাটি আবিষ্কার করেন।

আমার অমরনাথ যাত্রা ২০১৬ -এর পাতা থেকে

ভূমিকা – ২৩শে জুন আমি জ্বরে পরলাম, এত জ্বর যে আমি নিজে থেকেই যাবনা বলে ঠিক করলাম, আমার এই যাওয়া নিয়ে বাড়িতে একপ্রস্থ নাটক হল। অবশেষে আমার স্ত্রী আমাকে ঠিক রাজি করে ফেলল যাবার জন্য। প্রথমেই অসংখ্য ধন্যবাদ আমার স্ত্রীকে, তাঁর চেষ্টা আর অনুপ্রেরণা ছাড়া আমার পক্ষে এই যাত্রাটি সম্ভব হতনা। যাবার একদিন আগে টিভির খবর থেকে জানতে পারলাম ভারতীয় সেনা এবং আতঙ্কবাদীদের মধ্যে বেশ গুলিবর্ষণ হয়েছে, এই শুনে আমার গোটা পরিবার খুব চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পরল। এইরকম পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও ২৫শে জুন ২০১৬, আমরা অমরনাথের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দিলাম কলকাতা থেকে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার সফরসঙ্গী মধু।আমাদের মধ্যে আগেথেকেই ঠিক করা ছিল অমরনাথ যাত্রার পর আমরা দুজন আলাদা আলাদা ভাবে ট্র্যাভেল করব। মধু চারধাম যাত্রা করবে আর আমি আমার প্ল্যান অনুযায়ী ট্র্যাভেল করব। মধু হল অত্যন্ত ধর্মভীরু মানুষ আর আমি তাঁর ঠিক উল্টো। এত অমিল থাকা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে একটি অদ্ভুত রসায়নের জন্ম নিয়েছিল। ওর নানান কীর্তিকলাপ আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। আর এটাও খুব সত্যি যে, পুরো যাত্রায় ও আমাকে অসম্ভভ সাহায্য করেছে। যদি ও আমার সঙ্গে না থাকত, তাহলে অমরনাথ যাত্রার নির্দিষ্ট দিনের আগে অমরনাথ যাত্রা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। সে যাইহোক, ২৭শে জুন প্রায় সন্ধ্যে হবে এমন সময় আমরা জম্মু গিয়ে পৌঁছলাম। ট্রেনটি প্রায় তিনঘণ্টা দেরিতে ঢুকেছিল। সেইদিনটা স্টেশনের পাশেই বৈষ্ণবধামের ডরমেটরিতে কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যেবেলা মধু লাঙ্গারের কিছু কাগজপত্র নিয়ে বসল, যে লাঙ্গারের সঙ্গে ও সম্পর্কযুক্ত। আমিও যতটা পারলাম ওকে কাজে সাহায্য করলাম। সেই রাতে আমি ঘুমতে পারলামনা ওর কিছু অদ্ভুত কাজকর্মের জন্য। এখন অবশ্য বুঝি ওটা খুব একটা অদ্ভুত ছিলনা, হঠাৎ করে সেই রাতে ও হনুমানচালিসা পড়তে শুরু করল, শুধু কি তাই!!! ওঁ নম শিবায়, জয় ভোলে কি, ব্যোম ব্যোম ভোলে আরও কত কিছু সব। সেদিন ওই ডরমেটরিতে যারা যারা ছিল তারাও দেখি ওই মধুর মতই শুরু করল। মনে মনে বললাম, ঘাটের মড়ারা আমায় শুতে দে। পাগল হয়েগেছিলাম সেই রাতে, কিন্তু একটাও রা কাটিনি মুখ দিয়ে।

Chandanwari during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

প্রথম দিন – ২৮শে জুন ২০১৬

ঠিক জানা নেই কাশ্মীরে কাক ডাকে কিনা…তবুও কাকডাকা ভোরে এক কাপ গরম চা খেয়ে বেড়িয়ে পরলাম। জম্মু স্টেশন থেকে ৫/৬ কিমি দূরে জম্মু বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছলাম। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে রওনা দিলাম পহেলগাঁও এর উদ্দ্যেশে।দুপুর একটা নাগাদ গাড়ির ড্রাইভার পাহাড়ের কোন এক অজানা জায়গায় গাড়ি থামাল দুপুরের খাবারের জন্য। মধু খাবেনা বলে বেঁকে বসলো, কারণ হিসেবে বলল হোটেলের সব কর্মচারী ও রাধুনিরা মুসলিম। ওর যুক্তি অনুযায়ী অমরনাথ যাত্রার আগে এমন কিছু ও করবেনা যেটা হিন্দু ধর্মের ………। এরকম নানান যুক্তি যেগুলো আমার কাছে মূল্যহীন, তাই খাঁড়া করল।ওর এই জ্ঞান ও যুক্তি কোনটাই আমার হজম হলনা উল্টে খানিকটা খারাপই লাগলো। আসলে আমাদের দুজনেরই খিদে পেয়েছিল, আর আমি নিজেকে যতদূর চিনি, যেকোনো পরিস্থিতিতেই আমি ট্র্যাভেল করতে পারি, কিন্তু ও পারেনা। আমি অনেক চেষ্টা করলাম বোঝাবার যাতে ওখানেই খেয়ে নেয়, কিন্তু কিছুতেই ও শুনলনা উপরন্তু আরেকটি যুক্তি খাঁড়া করল আমি গরুর মাংস খাই মুসলমানের মত, মানে ওর ভাষায় ‘গরুখেকো’ তাই আমার পক্ষে ওর অনুভুতি বোঝা অসম্ভব। অগত্যা কোন উপায় না দেখে গাড়ির ড্রাইভার কে গিয়ে আমি অনুরোধ করলাম যে কোন একটি ‘ঠিকঠাক’ বা অরিজিনাল আদর্শ হিন্দু হোটেলে গাড়ি দাড় করাতে। শুনে সে মুচকি হাসল। শেষ বিকেলে গিয়ে পৌঁছলাম পহেলগাঁওতে। এখানে বলে রাখা ভাল পহেলগাঁও কিন্তু মেষপালকদের গ্রাম এবং অমরনাথ যাত্রার বেসক্যাম্পও বটে। আবার ওখান থেকে গাড়ি ধরলাম, উদ্দ্যেশ্য চন্দনওয়ারি। খানিক রাত হল পৌঁছতে।

খানিকটা দূর হাঁটার পর আমরা আমাদের গন্তব্য আমাদের লাঙ্গার বা ভান্ডারায় গিয়ে পৌঁছলাম। ওখানে সবাই আমাদের খুব উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। সেখানে সবাই আমাদের বিশেষত আমার অচেনা হলেও তারা আমাদেরকে দেখেই অত্যন্ত খুশি হল, এখানেই আমার সঙ্গে প্রথম কমলনাথ জি, অশোকজি এবং প্রধান জির সঙ্গে পরিচয় হল। কিছুক্ষন তাদের সঙ্গে কথা বলার পর সহজ হয়ে গেলাম। আসলে যে জায়গাটি তে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম সেটি লাঙ্গারের গুদামঘর। অর্থাৎ সেই সংস্থার লাঙ্গার ততদিনে শেষনাগে তৈরি হয়ে গেছে। তাই আমাদের দুজনকেই শেষনাগ পৌঁছতে হবে এবং তীর্থযাত্রীদের সেবা বা লাঙ্গারের অন্যান্য কাজ করতে হবে। সেদিন রাতেই জানা গেল আমাদের লাঙ্গারের পরিচয়পত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে এবং তারজন্য তারপরদিন সকালবেলা আমাদেরকে শ্রীনগরের অমরনাথজি স্রাইনবোর্ডে যেতে হবে। সেইরাত টা বেশ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিলাম কিন্তু খানিকটা ‘জয় ভোলে আর হনুমানচালিসা’ শোনার পর।

BongBlogger during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

দ্বিতীয় দিন – ২৯শে জুন ২০১৬

বেশ ভোরে আমার ঘুম ভাঙল সেদিন, দেখলাম সবাই ঘুমিয়ে তখনও। জুতো পরলাম আর বেরিয়ে পরলাম হাঁটতে। ওই ভোরে কাশ্মীরের প্রকৃতি যেন অপরূপা, বুঝলাম সত্যি কাশ্মীর পৃথিবীর স্বর্গ। ক্যাম্পে ফিরে দেখলাম সবাই জেগে গেছে ততক্ষণে। এককাপ চায়ের সঙ্গে সকালের খাবারটা সেরে নিলাম। ভানডারার কাজের সুবিধার জন্য তাদের নিজস্ব একটি গাড়ি আছে এবং সেই গাড়িটি বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, আগেই বলেছিলাম আমাদের স্রাইনবোর্ডে কাজে যেতে হবে তাই আমি, মধু, অশোক জি এবং পণ্ডিত জি বেরিয়ে পরলাম শ্রীনগরের উদ্দ্যেশে। ১১ টা নাগাদ গিয়ে পৌঁছলাম শ্রীনগরে আর কাজ শেষ হল প্রায় ৩ টে নাগাদ। গতরাতে আমি পণ্ডিত জিকে আমার ট্র্যাভেল প্ল্যান টা বলেছিলাম তাই উনি জানেন আমার লিস্টে অবন্তিপুরা আছে, উনি ঠিক করলেন আমরা চন্দনওয়ারি পৌঁছব অবন্তিপুরা হয়ে। হঠাৎ এই কথাটা শোনার পর আমি বেশ খুশি হয়ে গেলাম, যাইহোক অবন্তিপুরার মন্দির দেখে আমার মন ভোরে গেছিল। অবশ্য আমাকে আরও একবার অবন্তিপুরায় আসতে হয়েছিল, কিন্তু সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে।

BongBlogger during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Indian Army at Pissu Top during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

তৃতীয় দিন – ৩০শে জুন ২০১৬

খুব স্বাভাবিক নিয়মেই খুব ভোরেই আমি উঠেগেছিলাম সেদিন। সকালে সামান্য কিছু খেয়ে অবশেষে আমরা হোলি কেভ বা পুন্যগুহার দিকে যাত্রা শুরু করলাম চন্দনওয়ারি থেকে, তখন প্রায় সকাল সাতটা। একটু বলেনি , এটা কিন্তু মধুর পঞ্চমযাত্রা অমরনাথের উদ্দ্যেশে, আর আমার প্রথম যাত্রা। প্রথম দিকটায় ও একটু ঘাগু ট্রেকারের মত কেত নিচ্ছিল, কিন্তু আমি আমার ধৈর্যটা ধরে রাখছিলাম, কারণ আমি সবসময় ট্রেকিং -এর কৌশলগত দিকগুলো মাথায় রেখে ট্রেক করি আর কখনই হাঁটার সময় লোক দেখানো কায়দা করিনা। সবসময় মাথায় রাখি, হেঁটে প্রথমে গেলেই তার জন্য না কোন পুরস্কার পাব, না আমার কোন অফিসের তারা আছে, তাই আমি কখনো তাড়াহুড়ো করিনা। পিসটপের রাস্তা টা সামান্য খাঁড়াই, এবং এখানে শুধুমাত্র ওপরেই উঠতে থাকতে হবে, তাই সাধারণের জন্য এটা একটু কঠিন হতে পারে কিন্তু যারা ট্রেকিং করে তাদের জন্য খুব কঠিন হবেনা। তবে এটাও ঠিক যদি কেউ একটি গড়গতি তে ও আস্তে আস্তে হাঁটে তাহলে এই রাস্তাও সহজ হয়ে যাবে। হঠাৎ করে মধু সর্টকার্ট দিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে ডানহাতের কব্জিতে পেলো ব্যাথা। এরপর আর কিছু হোক না হোক মধু লাইনে চলে এলো। পিসুটপ্‌ অব্দি ভারতীয় সেনাবাহিনী কে দেখলাম বেশ সজাগ। অবশ্য অমরনাথের পুরো রাস্তাটাতেই সেনাবাহিনী সজাগ ছিল। কখনো কখনো হঠাৎ করেই মালবহনকারী খচ্চরের দল বেশ বিপদে ফেলছিল হাঁটতে, শুধু কি তাই!! সারা রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ওদের গোবরও বিপদে ফেলছিল হাঁটতে। দু’ঘণ্টা হাঁটার পর অবশেষে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম পিসুটপে। পিসুটপের নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখে পথে হাঁটার অসম্ভব কষ্টটাই গেলাম ভুলে, সত্যি বলতে, নিজের চোখে না দেখলে প্রকৃতি কত সুন্দর হতে পারে তা লিখে বোঝানো বড্ড কঠিন। পায়ের নিচে সবুজ আর বরফে ঢাকা পর্বতের চূড়া আমার চোখকে বেশ খানিকক্ষণ ব্যাস্ত রাখল, অবশেষে কিছুটা সময় জিরিয়ে নিয়ে পিসুটপকে বিদায় জানিয়ে হাঁটা শুরু করলাম শেষনাগের উদ্দ্যেশে।

Pissu Top during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Indian Army and Madhu during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

প্রায় দুটো, গিয়ে পৌঁছলাম শেষনাগে। শেষনাগের নিল সরোবর দেখে এত অভিভূত হলাম যে লোভ না সামলাতে পেরে খানিকটা নিচে নেমে সরোবরের ধারে গিয়ে বসলাম। হাতের মুঠোয় নিল সরোবর আর সামনে বরফে ঢাকা পাহাড় চুড়াগুলো কিছুক্ষনের মধ্যেই আমার সমস্ত ক্লান্তি দুর করে দিল। ওখানে খানিকক্ষণ বসে থাকার ফলে, শরীরটা এতটাই শিথিল হয়ে গেল যে, উঠে আবার হাঁটতে শুরু করাটা বেশ কঠিন লাগল। কোন উপায়ও ছিলনা কারণ ওখান থেকে আমরা যে লাঙ্গারে যাবো তার দুরত্ত্ব প্রায় ১ কিমি,তাই আরও ১ কিমি হাঁটতেই হবে। বেশ কিছুটা হাঁটার পর অবশেষে গিয়ে পৌঁছলাম লাঙ্গারে। সবাই যথারীতি আমাদেরকে খুব উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। এখানেই আমার সঙ্গে প্রথম দেখা হল গোর্খা জির। চা বিস্কিট খাওয়ার পরে ওদের সঙ্গে গল্প জমে গেল। কিন্তু গোর্খা জি বারবার বলতে শুরু করলেন দুপুরের খাবারটা সেরে নিতে। অগত্যা তাড়াহুড়ো করে পরিষ্কার হয়ে নিয়ে দুপুরের খাওয়া সারলাম। কিছুক্ষন পর হাঁতে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম। আসলে নেচার ফটোগ্রাফি করার লোভেই আমার এই বেরিয়ে পরা। এই যাত্রার ঠিক আগেই এটা নিয়ে মধুর কাছে অনেক কথা শুনেছি, যেমন, খুব কঠিন রাস্তা, যখন তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে, আর অধিকাংশ রাস্তাই খুব ভারি বরফে ঢাকা থাকবে এবং Acute Mountain Sickness ও হতে পারে। ওই তালিকায় আরও অনেক গল্প ছিল যা সাধারণ মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কোথায় বরফ, কোথায় কম অক্সিজেন এর চাপ আর কোথায়বা ভয়ঙ্কর রাস্তা!!!! এটা শুনেই মধু একটু বিষণ্ণ গলায় বলল “অপেক্ষা করো, সব দেখতে পাবে”, উত্তরে আমিও বললাম “বেশ দেখাই যাবে”… চোখে পরল মধু প্রায় ডজন খানেক ওষুধ খেলো, শরীরের নানান ব্যাথা ও নানা রোগের জন্য। আমাকেও অনুরোধ করল ওষুধ খাবার জন্য যাতে আগে থেকেই অতিরিক্ত সতর্ক হওয়া যায়। আমি তো দিব্য সুস্থ ছিলাম তাই ওকে না করেদিলাম। সেই রাতটা আমরা শেষনাগেই কাটালাম।

Sheshnag Lake during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Sheshnag Lake during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Sheshnag during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Sheshnag during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

Langars at Sheshnag during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, IndiaInside our Langar at Sheshnag during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

চতুর্থ দিন – ১লা জুলাই ২০১৬

এই দিনটাই ছিল আমাদের শেষদিন অমরনাথের গুহায় পৌঁছোবার, তাই সকাল সকাল উঠে পরলাম। সামান্য কিছু খেয়ে সকাল সাতটায় বেরিয়ে পরলাম গুহার উদ্যেশে। পথে সেরকম তীর্থযাত্রী পেলামনা, তার কারণ অবশ্য আপনাদের আগেই বলেছি যে, আমরা তীর্থযাত্রা শুরু হওয়ার ঘোষিত দিনের কিছু আগেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমি শুনেছিলাম দর্শনের মরশুমে এই রাস্তায় পা ফেলার জায়গা থাকেনা এত ভিড় হয়, এর ফলে তীর্থযাত্রীদের ওই পাহাড়ি পথে হাঁটা সত্যি দুষ্কর হয়ে যায়। এখানেই প্রথম খানিকটা রস্তায় বরফ পেলাম। আমার অবশ্য এর আগে স্নো ট্রেকিঙের অভিজ্ঞতা ছিল, তাই আমার পক্ষে খুব একটা কঠিন হলনা। মহাগুনা টপ্‌ অব্দি রাস্তাটা বেশ খাঁড়াই ছিল এবং এটা প্রায় চৌদ্দ হাজার ফিট ওপরে অবস্থিত। এটাই হল অমরনাথ যাত্রার পুরো রাস্তার সবথেকে উঁচু জায়গা। আমরা কিছু নামহীন স্রোত, নামহীন কিছু ঝর্না পেরলাম। প্রায় বারোটা বেজে গেল মহাগুনা টপ্‌ পৌঁছতে। ওখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম পঞ্চতরণীর উদ্দ্যেশে। চন্দনওয়ারি থেকে মহাগুনা টপ্‌ অব্দি পুরো রাস্তাটাই ছিল চড়াই। এবার আমাদের উতরাই এর পালা, প্রায় চৌদ্দ হাজার ফিট থেকে নামতে হবে বারো হাজারে, কারণ পঞ্চতরণী বারো হাজার ফিটে অবস্থিত। এখানে একটা কথা বলে নেয়া ভাল সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারনা আছে উতরাই চড়াই এর থেকে সোজা। ধারনাটি ভুল।

Mahaguna Top during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Crossing Rivulet during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Mahaguna Top during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Mahaguna Top during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

বিকেল তিনটের পর ভারতীয় সেনা পঞ্চতরণীর মিলিটারি চেকপোস্ট কাউকে পেরতে দেয়না। তাই আগে থেকেই আমরা ঠিক করেছিলাম যে, যেভাবেই হোক তিনটের আগে আমাদেরকে পঞ্চতরণী পৌঁছতেই হবে। ভাগ্যক্রমে তিনটের অনেক আগেই আমরা পৌঁছে গেছিলাম। হাতে খানিক সময় থাকাতে পঞ্চতরণী ঘুরে দেখতে পেলাম এবং অবশ্যই ছবিও তুললাম। ওখানেই আমি খানিকটা চেষ্টা করলাম মাচোই গ্লেসিয়ার যেটা মাত্র সাত কিমি দূরে এবং কোলাহোই গ্লেসিয়ার যা এগারো কিমি দূরে অবস্থিত তাদের স্থাননির্দেশ করার। কিন্তু কিছুই হাতে এলনা।

Panchtarni during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Valley of Panchtarni during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

পঞ্চতরণী পাঁচটি নদির সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। এটা বিশ্বাস করা হয় যে এই পাঁচ নদির উৎস হল শিবের জটা এবং তাই এই জায়গার নাম হয়েছে পঞ্চতরণী। সাধারণত তীর্থযাত্রীরা পঞ্চতরণীতে রাত কাটায় এবং পরদিন সকালে গুহার উদ্দ্যেশে রওনা দেয়। কিন্তু আমাদের অন্য পরিকল্পনা ছিল তাই আমরা সেই দিনই গুহার উদ্দ্যেশে হাঁটা শুরু করেছিলাম। অবশেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমরা অমরনাথ গুহার সামনে পৌঁছলাম। সেখানেই একটি তাঁবু ভাড়া নিয়ে রাতটুকু কাটালাম। এখানে তাঁবুর ভাড়া মাথাপিছ ১৫০ টাকা ভাড়া।

পঞ্চম দিন – ২রা জুলাই ২০১৬

অনেক ভোরে ঘুম ভাঙল, তখনও আকাশ কালো। আর মধু গভীর ঘুমে। আকাশ কালো হলে হবে কি, সাদা বরফের চাদরের জন্য চারদিক যেন আলো হয়ে আছে। সকালে তাঁবুর মালিক এক বালতি গরম জল দিয়ে গেল মধুর স্নানের জন্য, তার জন্য দাম অবশ্য নিল ৬০ টি টাকা। ওই বরফজমা ঠাণ্ডায় আমার স্নান করার কোন রুচি, ভালবাসা, ইচ্ছে কোনটাই ছিলনা। মধু অবশ্য আমাকে স্নান করার জন্য খুব জোরাজুরি করল, কারণ দর্শনের আগে স্নান করাটা নাকি খুব জরুরি। ওকে বললাম “গতরাতে ভগবান শিবের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে এবং শিব আমাকে বলেছেন ততক্ষণ অব্দি স্নান না করতে যতক্ষণ না আমি নিরাপদে হোটেলে পৌঁছই”, আমি তো মজা করছিলাম, কিন্তু হঠাৎ দেখলাম মধু গম্ভীর হয়ে গেল। স্নান করে ফিরে এসে ও আমায় বলল দর্শন শেষ না হবার আগে অব্দি আমি যেন ওকে না ছুঁই এবং ওর থেকে যেন একটু দুরত্ব বজায় রাখি। আমার তো এটা শুনে মনে হল আমার ওপর ফতোয়া জারি হয়েছে। আমার গায়ের নোংরা জামাকাপড় নিয়েও ওর সমস্যা ছিল। আমি বুদ্ধি করে ওটা ম্যানেজ করলাম। যাইহোক আমাদের তাঁবুর গায়ে লাগোয়া দোকান থেকে প্রসাদ কিনলাম যদিও প্রসাদ বিক্রেতা মুসলমান। শুধু কি তাই!!!!! ওখানে যত প্রসাদের দোকান আছে সেখানকার সব দোকানী মুসলমানই। চারদিকে এবং খানিকটা আমার গায়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে মধু পুন্যগুহার উদ্দ্যেশে রওনা দিল।

Amarnath Base Camp during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

গুহার সামনে গিয়ে যখন পৌঁছলাম দেখি দর্শন কিছুক্ষনের জন্য বন্ধ আছে, কারণ ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী রাজনাথ সিং সেই সময় দর্শন করছিলেন। ভারতীয় সেনারা সেই সময় গুহার প্রধান প্রবেশদ্বার ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। আমরা এবং বাকি সবাই প্রায় দু’ঘণ্টা বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের তাঁবু থেকে এক/ দু’কিমি দূরে ছিল প্রবেশদ্বার, তারপরেও ৫০/৬০ টা সিঁড়ি চড়ে পৌঁছতে হবে বরফের লিঙ্গের সামনে। হঠাৎ করে মধুর মধ্যে অদ্ভুত একটা পরিবর্তন দেখলাম, দেখে মনে হল যেন আমি আমার শাশুড়িকে ওর মধ্যে দেখছি। যাইহোক, আমি একা একাই গুহায় গিয়ে পৌঁছেছিলাম শেষপর্যন্ত, এবং প্রথমবার বরফের লিঙ্গ দেখেছিলাম। যে পুরোহিত বরফের লিঙ্গের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি খুব শক্ত করে আমার হাতটা চেপে ধরলেন, এবং বললেন ” ভালো করে দর্শন কর” প্রায় দু থেকে তিন মিনিট আমার হাতটা এত শক্ত করে উনি ধরেছিলেন যে আমি ওখান থেকে সরেও যেতে পারছিলামনা। ওনার এই আচরণে আমি যার-পর-নাই অবাক হয়েছিলাম।

ওখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় কাটালাম এবং মানুষের চোখেমুখে অদ্ভুত এক বিশ্বাস লক্ষ্য করলাম। এছাড়াও আরও অনেক কিছুই লক্ষ্য করলাম, যেমন, ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে লিঙ্গের ছবি তোলা এবং ছেলে ছোকরাদের লিঙ্গের সঙ্গে সেলফি তুলতেও দেখলাম। (মনে মনে গুনগুণ করলাম “চল বেটা সেলফি লে লে রে/ মাস্তি কি ট্যাঙ্কীমে তানিক ডুবকি লে লে রে” ) ঠিক বুঝে উঠতে পারলামনা এরা কি করে এত অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশ নিয়ে দাঁড়িয়েথাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বোকা বানাল ( ক্ষমতা ? হুম্‌ম্‌ম্‌ম্‌ম্‌ম্‌…টাকা? হুম্‌ম্‌ম্‌…)। এক কোণে মধুকে আবিষ্কার করলাম, দেখলাম ও বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠানে ব্যাস্ত। ওর সব শেষ হবার পরে আমরা আবার একসাথে হলাম। প্রথমেই ও জানতে চাইল আমার কেমন অভিজ্ঞতা হল। উত্তরে আমি জানালাম “অসাধারণ”। ও পুরোহিতের মত মাথা নাড়তে নাড়তে হাসতে লাগলো। আমার একটু মনটা খারাপই হয়েগেছিল মিলিটারির ব্যবহারে, একটা সামান্য ছোট ক্যামেরা নিয়ে আমাকে ঢুকতে দেয়নি, অথচ কত লোক ডিএসএলআর নিয়ে ঢুকে গেছে। যথেষ্ট বলেছি, এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাইনা।

On the Way to Baltal during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

আমরা তাঁবুতে ফিরে এলাম এবং খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এবার ওর (মধুর) সময় অভিজ্ঞ মন্তব্য করার। যদিও কোন মন্তব্য করলনা তবে কোন কারণ ছাড়াই ও বেশ বাঁকা হাসি হাসছিল। যাইহোক, আমি উতরাই এর কথা ভেবে একটু শরীরচর্চায় মন দিলাম। দুপুর একটা নাগাদ অবশেষে আমরা বালতালের উদ্দ্যেশে রওনা দিলাম এবং সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা নাগাদ বালতালে (সেকেন্ড মাইল) পৌঁছলাম। আমার জানা ছিলনা যে ওখান থেকেও আরও দু/তিন কিমি হাঁটলে বালতাল বাসস্ট্যান্ড গিয়ে পৌঁছব। এরমধ্যে হঠাৎ করে শুরুহল বৃষ্টি, এবং আমরা একটি লাঙ্গারে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। অবশেষে রাত আঁটটা নাগাদ বালতাল বাসস্ট্যান্ড গিয়ে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি গাড়ি বন্ধ, আর আমাদের ঐ দিনই শ্রীনগরে ফিরে আসার পরিকল্পনা ছিল। কোন উপায় নেই, তাই সেই দিনটা থাকতে হবে বালতালে, তাই সেইরাতটা বালতালের এক তাঁবুতে থেকে গেলাম।

Kali Mata Temple during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Aerial View of Baltal Base Camp during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India Baltal at Night during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

 

কি করবেন আর কি করবেন না

1. শরীরচর্চা করুন বিশেষত দম বাড়াবার ব্যায়াম, অন্তত যাত্রার একমাস আগে থেকে।
2. সঠিক গরম জামাকাপড় নেবেন।
3. বর্ষাতি নেবেন (ওপর এবং নিচের)।
4. সঠিক জুতো নেবেন (ট্রেকিং করার জন্য উপযুক্ত জুতো)
5. হাঁটার জন্য ট্রেকিঙের জন্য ব্যবহৃত স্টিক।
6. একটা সচিত্র পরিচয়পত্র।
7. পরিমানমত ট্রেল মিক্স, চকলেট, ক্যান্ডি এবং জলের বোতল।
8. প্রয়োজনীয় ওষুধ।
9. কোল্ড ক্রিম ও লিপ বাম্‌।
10. পরিমানমত জল খাবেন হাঁটার সময়। অন্তত দু থেকে চার লিটার জল খান প্রতিদিন, এতে উচ্চতাজনিত অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।
11. চড়াই এর সময় ভিড়ের জন্য পথ আটকে থাকতে পারে তাই সৌজন্য দেখিয়ে অন্যকে পথ ছেড়ে দিন।
দয়া করে অমরনাথ যাত্রার প্রশাসকদের নিয়মাবলি মেনে চলুন।

সম্পূর্ণ তালিকা দেখার জন্য এখানে
1. ট্রেকিঙের সময় জিন্সের প্যান্ট পরবেন না।
2. ট্রেকিঙের আগে ও পরে ধূমপান করবেন না।
3. চটি পরে হাঁটবেন না।
4. প্লাস্টিকের তৈরি প্যাকেট, বোতল যেখানে সেখানে ফেলবেন না।
5. কোনরকম নেশার দ্রব্য বিশেষত গাঁজা ব্যবহার করবেন না।
6. মাথায় রাখবেন হাঁটার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না, কারণ আগে গেলে আপনার জন্য কোন পুরস্কার নেই। নিজের শরীরের ওপর অযথা চাপ দেবেন না, এরফলে কিন্তু উচ্চতাজনিত অসুস্থতা হতে পারে।

আমার অমরনাথ যাত্রা ২০১৬ এর সম্পূর্ণ অ্যালবাম দেখুন

Holy Cave of Amarnath during Amarnath Yatra 2016, Jammu and Kashmir, India

 

বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ- মধুসূদন, অশোক জি এবং প্রধান জি। বাংলা তর্জমা ও টাইপিং এ সাহায্য করার জন্য পঞ্চতপা কে ধন্যবাদ।

 

স্বত্ব © বংব্লগার আপনার যদি মনে হয় বা ইচ্ছা হয় তাহলে আপনি এই লেখাটি শেয়ার করতে পারেন কিন্তু দয়াকরে এর লেখকের নাম ইন্দ্রজিৎ দাস উল্লেখ করতে ভুলবেন না। ভুলে যাবেননা চৌর্যবৃত্তি মহাদায়, যদি পড়েন ধরা।যদি আপনি আপনার নিজের ছবি এখানে দেখতে পান এবং তাতে যদি আপনার কোন রকম আপত্তি থাকে তাহলে অবশ্যই ই-মেল করে আপনি উপযুক্ত প্রমাণসহ আপনার দাবি জানাতে পারেন।দাবিটি ন্যায্য প্রমাণিত হলে, সে ক্ষেত্রে ছবিটি সরিয়ে ফেলা হবে।